চোখের জলে গুলতেকিন

,

 গুলতেকিন সাবেক স্বামীর মৃত্যুর পর প্রথম প্রকাশ্যে এসে চোখের জল লুকিয়ে রাখতে পারেননি গুলতেকিন খান। শনিবার সন্ধ্যায় সদ্য প্রয়াত লেখক হুমায়ূন আহমেদের স্মরণে এক নাগরিক শোকসভায় এসে পুরো মিলনায়তনকে চমকে দেন গুলতেকিন খান, যার খান নামটি অনুচ্চ থেকেছে অগণিত হুমায়ূন পাঠকের কাছে তিরিশ বছর। বাংলা বইয়ের ইতিহাসের জনপ্রিয়তম লেখকদের একজন হুমায়ূনের লেখায় ছায়ার মতই যেন উঠে আসতেন তিনি, গুলতেকিন আহমেদ নামটি তাই পাঠকদের অতি পরিচিত। হুমায়ূন আহমেদের স্মরণে শাহবাগে জাতীয় গণ গ্রন্থাগারে শওকত ওসমান স্মৃতি মিলনায়তনে এ সভার আয়োজন করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট।গুলতেকিন আসেন বিকাল তখন প্রায় চারটা। সঙ্গে পুত্র নুহাশ, দেবর মুহাম্মদ জাফর ইকবাল ও তার স্ত্রী ইয়াসমীন হক। পরনে সাদা-কালো শাড়ি। হালকা সাজ। চোখে মুখে বিষণ্ন অবসন্নতা। হুমায়ূন আহমেদের নাগরিক স্মরণভায় সমবেত সবাইকে চমকে দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে সামনের সারিতে আসন গ্রহণ করেন গুলতেকিন ও তার সঙ্গীরা। সভায় নেমে আসে এক ব্যথিত নীরবতা। এ দৃশ্য গতকাল রাজধানীর সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারের শওকত ওসমান স্মৃতি মিলনায়তনের।
গুলতেকিন দেশে ফিরেছেন দু’দিন আগে। এরপর প্রকাশ্যে আসা তার এই প্রথম। প্রয়াত সাবেক স্বামীর স্মরণসভায় এসে আবেগ চাপা দিতে পারেননি। সিক্ত হয়েছেন নিঃশব্দ অশ্রুতে। চোখ মুছেছেন। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটেছে নয় বছর আগে। এর মধ্যে কোনভাবে কোন সম্পর্ক রাখেননি। স্বামীর বা স্বামীকে নিয়ে কোন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি কখনও। গতকালের স্মরণ-বরণের আয়োজনে স্মৃতির সরণি বেয়ে যেন হারানো স্বামীর সান্নিধ্যে গিয়েছিলেন তিনি। তবু সাধ্যমতো সামলে রেখেছেন নিজেকে। অনুষ্ঠানে তাকে ঘিরে ব্যাপক কৌতূহল। আগ্রহ। শ্রোতা-দর্শক, সাংবাদিক সকলের মনোযোগ তার দিকে। চারপাশে ক্যামেরার ভিড়। ঘন ঘন ফ্লাশ। তবু কি আশ্চর্য সংযত গুলতেকিন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ব্যক্তিত্বদের অনেকেই কাছে এসে সান্ত্বনা জানান তাকে। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান জানতে চান, আবার কি আমেরিকায় চলে যাবে? গুলতেকিন বলেন, না। এখন আর যাচ্ছি না। আনিসুজ্জামান জিজ্ঞেস করেন, মেয়েরা যদি বলে? গুলতেকিন বলেন, ওরাই তো দেশে নিয়ে এসেছে আমাকে।
অনুষ্ঠান শেষে মিলনায়তন থেকে বেরিয়ে আসেন গুলতেকিন। তখনও ক্যামেরা পিছু ছাড়ে না তার। ঘন ঘন জ্বলছে ফ্লাশ। এর মধ্যেই গাড়িতে গিয়ে ওঠেন। সঙ্গে নুহাশ, জাফর ইকবাল, ইয়াসমীন হক। গাড়ির পেছনে তুলে দেয়া হয় হুমায়ূন আহমেদের একটি পোর্ট্রেট। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উপহার। জটলা বাড়ে সংবাদকর্মীদের। প্রশ্ন করতে উসখুস তারা। কিন্তু প্রশ্ন করা হয় না। গাড়ি স্টার্ট নেয়। এগিয়ে যায়। গাড়িতে হুমায়ূন এখন একটি ছবি।
গুলতেকিনকে দেখেই জড়িয়ে ধরেন বরেণ্য লেখক হুমায়ূন আহমেদের মা আয়েশা ফয়েজ। বিলাপ করতে থাকেন তিনি। এ সময় অঝোর ধারায় কেঁদেছেন গুলতেকিন-ও। শুক্রবার ইফতারির আগে গুলতেকিন তার প্রিয় শাশুড়ি আয়েশা ফয়েজকে দেখতে যান আহসান হাবিবের পল্লবীর বাসায়। সেখানে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। হুমায়ূন কেমন করে মারা গেলেন, তাকে দাফন নিয়ে যে রাজনৈতিক নাটক হয়েছে তা নিয়েও দুঃখ করেন আয়েশা ফয়েজ। মায়ের বিলাপের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান গুলতেকিন। আর এর মধ্য দিয়েই ঘটে তার অনেক দিনের জমানো কষ্টের বহিঃপ্রকাশ। মৃত্যুর আগ থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত হুমায়ূনের প্রতি তার সঙ্গে থাকা মানুষগুলোর অবহেলা, নুহাশ পল্লীতে কবর দেয়া নিয়ে শাওনের বাড়াবাড়ি, মৃত স্বামীর লাশ নিয়ে আইনি লড়াইয়ে যাওয়ার ঘোষণা- ব্যথিত করেছে সবকিছুই গুলতেকিনকে। সূত্র জানায়, সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে গুলতেকিন চেয়েছেন হুমায়ূনের যেন কোন কষ্ট না হয়, তার আত্মা যেন কষ্ট না পায়, তার লাশ বারডেমের হিমঘরে যেন দিনের পর দিন পড়ে না থাকে। এ কারণে তিনি বড় মেয়েকে বলেছিলেন তার বাবাকে নুহাশ পল্লীতে দাফন করার দাবি মেনে নেয়ার। শাওন এক পর্যায়ে বিষযটি নিয়ে আদালতে যেতে চেয়েছিলেন। মধ্যস্থতা বৈঠকে তিনি বলেছিলেন, দুই জন ব্যারিস্টারকে নিয়োগ দেয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। আদালত সিদ্ধান্ত না দেয়া পর্যন্ত লাশ বারডেমের হিমঘরেই থাকবে। হুমায়ূনের ভাই ড. জাফর ইকবাল বিষয়টি টের পেয়ে নুহাশ পল্লীতেই দাফনে রাজি হয়ে যান। কারণ তিনি চাননি তার ভাইয়ের আত্মা আরও কষ্ট পাক। গুলতেকিনের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, কেবল শাওনের জন্যই তিনি হুমায়ূনকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন। জেদ, রাগ, দুঃখ, ক্ষোভ, অভিমান, অপমানে হুমায়ূনকে দূরে সরিয়ে দিলেও তার স্মৃতি মন থেকে মুছে ফেলতে পারেননি। হুমায়ূনের জন্য নীরবে অনেক কেঁদেছেন। হাসপাতালে তার ঘনিষ্ঠ লোক পাঠিয়ে চিকিৎসার খবর নিয়েছেন। দেশে ফেরার পর তিনি হুমায়ূন আহমেদের জন্য পারিবারিকভাবে দোয়া, মিলাদ মাহফিল, কোরানখানির আয়োজন করেছেন। তিনি অনেকটা গোপনেই এসব করেছেন। এ জন্য বাইরের মানুষকে দাওয়াত করেননি। ঘরোয়া পরিবেশে যতখানি সম্ভব তা করছেন বলে জানান তার পরিবারের এক সদস্য। তার জন্য এখনও দোয়া-দরুদ করা হচ্ছে। এছাড়া, বাইরেও সন্তানদের দিয়ে দোয়া করিয়েছেন।
সূত্র জানায়, শুক্রবার এক ঘণ্টা ধরে হুমায়ূনের সঙ্গে তাদের নানা স্মৃতিচারণ করেন আয়েশা ফয়েজ ও গুলতেকিন । স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন। গুলতেকিন তার দেবর আহসান হাবিবের বাসায় সন্তানদের ও আরেক দেবরকে নিয়ে একসঙ্গে ইফতারি করেন। ইফতারের আগে তারা সবাই এক হয়ে হুমায়ূনের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেন।
সূত্র জানায়, হুমায়ূনের সঙ্গে অভিমানে যোগাযোগ ও দেখা না করলেও তার মা, ভাইবোনসহ পরিবারের সবার সঙ্গে গুলতেকিনের যোগাযোগ ছিল।
রাত আটটার পর সন্তানদের নিয়ে পল্লবী থেকে ফিরে যান তিনি বনানীর বাসায়। আহসান হাবিব জানান, তিনি এসে এক ঘণ্টার বেশি সময় ছিলেন। যতটুকু সময় ছিলেন এর বেশির ভাগ অংশ জুড়েই ছিল হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে স্মৃতিচারণ। নুহাশ পল্লী নিয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিনা গুলতেকিন ও তার সন্তানরা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা এখনও ঠিক হয়নি। যতটুকু জানি ৪০ দিন পর্যন্ত এটি সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এরপর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এ সিদ্ধান্ত পারিবারিকভাবেই নেয়া হবে। তিনি বলেন, সেখানে যেসব স্টাফ আছেন তারা বেশ দক্ষ। তারা পরিস্থিতি সামলে নিতে পারবেন, কোন সমস্যা হবে না।
উল্লেখ্য, ১৯৭৩ সালে গুলতেকিন খানের সঙ্গে বিয়ে হয় হুমায়ূন আহমেদের। তাদের ঘরে তিন মেয়ে এবং দুই ছেলে জন্মগ্রহণ করে। তিন মেয়ের নাম নোভা আহমেদ, শীলা আহমেদ, বিপাশা আহমেদ এবং ছেলের নাম নুহাশ হুমায়ূন। তাদের আরেকটি ছেলে অকালে মারা যায়। গুলতেকিনের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের পর ২০০৫ সালে হুমায়ূন আহমেদ শাওনকে বিয়ে করেন।



পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য প্রদান করতে লগইন করুন। আমাদের সাইটে আপনার একাউন্ট না থাকলে এখানে নিবন্ধন করুন।


Get Facebook Like
পাতার শুরুতে