আসমানীরে দেখতে যদি
৩ ভাদ্র ১৪১৯, Saturday, August 18, 2012 || বরিশাল নিউজ ডেস্ক ||
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর পল্লীকবি জসীমউদদীনের সেই আসমানী মারা গেছেন (ইন্নালিল্লা… রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৯ বছর।
শনিবার ভোর তিনটার দিকে ফরিদপুরের নিজ বাড়িতে তিনি মারা যান।
দুপুরের নামাজের পর জানাজা শেষে বাড়ির উঠানে আসমানীকে দাফন করা হবে বলে জানান তার নাতি সবুজ।
জেলা প্রশাসক হেলাল উদ্দিন আহমেদ জানান, দাফনের সব খরচ দেবে জেলা প্রশাসন। এতদিন আসমানীর চিকিৎসার সব খরচ শ্রমমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও জেলা প্রশাসন বহন করেছে।
পেছনের কথা: আসমানী কবিতাটি রচনার কারণ সম্পর্কে জনশ্রুতি থেকে জানা যায়, ১৯১৩ সালে ফরিদপুর সদর উপজেলার ঈষাণ গোপালপুর ইউনিয়নের ভানুরজঙ্গা গ্রামে আসমানীর জন্ম। আরমান মল্লিকের মেয়ে আসমানীর মাত্র ৯ বছর বয়সে বিয়ে হয় পাশের রসুলপুর গ্রামের মমিন মণ্ডলের ছেলে হাসাম মণ্ডলের সঙ্গে। তিনি দুই ছেলে ও ছয় মেয়ের জননী।
আসমানীর শ্বশুর মানিকগঞ্জের পীর রহিম উদ্দিনের ভক্ত ছিলেন। রহিম উদ্দিন বেশির ভাগ সময় আসমানীর শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করতেন। সেখানে জীর্ণ কুটিরে তিনি প্রায়ই মুর্শিদী গানের আসর বসাতেন। আর এই গানের টানে কবি জসীমউদ্দিন আসমানীদের বাড়িতে ছুটে যেতেন। সেখানেই আসমানীর সঙ্গে কবির পরিচয় হয়। সে সময় ওই বাড়ির পরিবেশ-পরিস্থিতি দেখে তিনি কবিতাটি রচনা করেন। কবির রচিত কবিতার পংক্তিগুলো আসমানীকে বাংলাসাহিত্যে অমর করে রেখেছে।
আসমানী ২০১১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রথম অসুস্থ হয়ে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে হন। এ সময় তার আমৃত্যু চিকিৎসার দায়িত্ব নেয় ফরিদপুর জেলা প্রশাসন।
হাসপাতালের চিকিৎসা শেষে শহরের টেপাখোলা এলাকায় সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত শান্তিনিবাসে আসমানীর থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
আসমানীর চিকিৎসা সহায়তার জন্য ‘আসমানী সহায়তা তহবিল’ গঠন করা হয়। এতে শ্রমমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, পাটমন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, এফবিসিসিআই সভাপতি একে আজাদ হাত বাড়িয়ে দেন। তারা প্রত্যেকেই ৫০ হাজার টাকা করে অনুদান দেন।
২০১২ সালের ২৩ জুন আসমানী আবার অসুস্থ হলে তাকে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।সেখানে থেকে ১ জুলাই উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।এখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়।
ঢাকায় এক মাস চিকিৎসা শেষে ২ আগস্ট ফরিদপুরের রসুলপুর গ্রামে নিজ বাড়িতে তাকে নেওয়া হয়। এতোদিন বাড়িতেই তিনি ছিলেন।
আসমানীকে নিয়ে সেই কবিতা
আসমানী
জসীমউদদীন
আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,
রহিমুদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।
বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,
একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।
একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে,
তারি তলে আসমানীরা থাকে বছর ভরে।
পেটটি ভরে পায় না খেতে, বুকের ক-খান হাড়,
সাক্ষী দিছে অনাহারে কদিন গেছে তার।
মিষ্টি তাহার মুখটি হতে হাসির প্রদীপ-রাশি
থাপড়েতে নিবিয়ে দেছে দারুণ অভাব আসি।
পরনে তার শতেক তালির শতেক ছেঁড়া বাস,
সোনালি তার গা বরণের করছে উপহাস।
ভোমর-কালো চোখ দুটিতে নাই কৌতুক-হাসি,
সেখান দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু রাশি রাশি।
বাঁশির মতো সুরটি গলায় ক্ষয় হল তাই কেঁদে,
হয় নি সুযোগ লয় যে সে-সুর গানের সুরে বেঁধে।
আসমানীদের বাড়ির ধারে পদ্ম-পুকুর ভরে
ব্যাঙের ছানা শ্যাওলা-পানা কিল্-বিল্-বিল করে।
ম্যালেরিয়ার মশক সেথা বিষ গুলিছে জলে,
সেই জলেতে রান্না-খাওয়া আসমানীদের চলে।
পেটটি তাহার দুলছে পিলেয়, নিতুই যে জ্বর তার,
বৈদ্য ডেকে ওষুধ করে পয়সা নাহি আর।
বাংলানিউজের সৌজন্যে



মন্তব্য প্রদান করতে লগইন করুন। আমাদের সাইটে আপনার একাউন্ট না থাকলে এখানে নিবন্ধন করুন।